#Oraon: আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ওঁরাওদের এগিয়ে রেখেছে

গার্গী আগরওয়ালা মাহাতো

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় বিহারের উপজাতি গোষ্ঠী ওঁরাও(oraon)। ওরাওঁ উপজাতিদের একটা অংশ নিজেদেরকে কুরুখ(kurukh) বলে পরিচয় দেয় যা তাদের বীর-রাজা কারাখ থেকে নেওয়া নাম।  ভারতীয় নৃতাত্ত্বিক সোসাইটির মতে, কোঙ্কন(konkan) ওঁরাও বা কুরুখ উপজাতিদের আদি বাসস্থান যেখান থেকে তারা ১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ছোট নাগপুর মালভূমিতে বসতি স্থাপন করেছিল বলে জানা যায়। ওঁরাওদের ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে উত্তর ভারতে চলে আসার পেছনে একাধিক কারন থাকলেও অতিরিক্ত জনসংখ্যা এবং বাহ্যিক চাপকে প্রধান কারন বলে মনে করা হয়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশী ওঁরাও বিহারের ছোটনাগপুর এবং মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মহারাষ্ট্র এবং আসামের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। তারা কুরুখ, সাদ্রি এবং হিন্দির মতো ভাষায় কথা বলে তবে ওরাওঁরা (oraon) প্রধানত কুরুখ (Kurukh)ভাষাকে তাদের মাতৃভাষা বলে, যেটি দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। লেখার ক্ষেত্রে তাঁরা দেবনাগরী লিপি ব্যবহার করে।

ওঁরাও উপজাতির লোকেরা আকারে খাটো বা উচ্চতায় মাঝারি হয়ে থাকে সেই সাথে  গাঢ় বর্ণবিশিষ্ট, চওড়া নাকযুক্ত এবং পুরু ঠোঁটযুক্ত এদের দৈহিক গঠনের মধ্যে পড়ে। ওঁরাও উপজাতির লোকেরা অত্যন্ত পরিশ্রমী হয়ে থাকে। বিহারে এরা মুন্ডা উপজাতির সাথে বসবাস করলেও এরা বাইরের জগতের লোকেদের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে অনেক বেশী উদার। ওঁরাওরা বিহারে মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। হিন্দু ওঁরাও ও খ্রিষ্টান ওঁরাও। হিন্দু ওঁরাওরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্ম (সারনাবাদ ) অনুসরণ করে, যা প্রকৃতি পূজার উপর ভিত্তি করে। ওঁরওদের বিভিন্ন সম্প্রদায় যেমন বিষ্ণু ভগত, বাচ্চিন্দ ভগত, করমু ভগত এবং তানা ভগত এরা হিন্দু শৈলীতে সারনাবাদকে অনুসরণ করতে শুরু করে। ওরাওঁরা বেশ কিছু সারনা সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেছে। ওরাওরা সূর্যকে বিরি (ধর্মেশের জন্য দেওয়া নাম) হিসাবে পূজা করে। ওঁরাও জনসংখ্যার অধিকাংশই সরনা , যেটি ছোট নাগপুর মালভূমিতে আদিবাসীদের আদিবাসী একটি ধর্ম । সারনা সম্প্রদায়ের লোকেরা একটি পবিত্র গহ্বরের ছায়াতলে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করেন। তারা সূর্যকে বিরি এবং চাঁদকে চাঁদো বলে পূজা করে এবং পৃথিবীকে ধরতি আয়ো (পৃথিবীকে মা বলে) বলে। চান্দো বিরি শব্দগুলো সারনা পূজায় ব্যবহৃত হয়। ধর্মেশ তাদের পরম সর্বশক্তিমান দেবতা। তানা ভগত ওরাওঁ সাধু যাত্রা ভগত এবং তুরিয়া ভগত দ্বারা গঠিত হয়েছিল। তানা ভগতরা ব্রিটিশদের দ্বারা তাদের উপর আরোপিত করের বিরোধিতা করেছিলেন এবং তাঁরা মহাত্মা গান্ধীর আগে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেছিলেন । স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সকল তানা ভগত গান্ধীর অনুসারী ছিলেন। তানা ভগতরা এখনও একটি খাদি কুর্তা, ধুতি এবং গান্ধী টপি (ক্যাপ) পরেন এবং তাদের টপিতে তিরঙা পতাকা রয়েছে। সমস্ত তানা ভগত মহাদেবের পূজা করে এবং তার উপরে একটি চক্র চিহ্ন সহ ত্রিবর্ণা, যা তাদের আঙিনায় স্থির থাকে।ওঁরাওদের যে অংশটি খ্রিস্টান ধর্ম মেনে চলে তাদের মধ্যে, রোমান ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট এই দুটি ভাগ রয়েছে । পরবর্তীকালে এই ওঁরাওদের মধ্যেও বেশ কয়েকটি শ্রেণী তৈরি হয়েছে।

ঐতিহ্যগতভাবে, ওরাওঁরা তাদের আচার-অনুষ্ঠান এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য বন ও খামারের উপর নির্ভর করত, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, তারা উন্নত কৃষি পদ্ধতি ব্যবহার করে উপজাতিদের মধ্যে বিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করেছে। বর্তমানে ওঁরাওদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। তারফলে অনেকেই আজ তাদের পরম্পরাগত কৃষিকাজ ছেড়ে চাকুরীর সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে চলে যাচ্ছে। এটি মূলত খ্রিস্টান, ওরাওঁদের মধ্যে বিশেষভাবে সত্য। এই অঞ্চলে অ্যাংলিকান, লুথারান এবং রোমান ক্যাথলিক মিশনারি সংস্থাগুলি সামাজিক কল্যাণের উপর প্রচুর জোর দিয়েছে। তাঁরা ধর্মান্তরিত ওঁরাওদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পাশাপাশি, উপজাতি সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য হাসপাতাল ও গোটা উপজাতীয় এলাকায় উচ্চমানের স্কুল খুলেছে। যার ফলস্রুতি রাঁচি ও ছোট নাগপুরের বৃহত্তম অংশ একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শিক্ষাকেন্দ্র। অ-খ্রিস্টান গোষ্ঠীর মধ্যেও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং সাক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।  

হিন্দু ওরাওঁদের মধ্যে বিনোদন ঐতিহ্যগ তভাবে তাদের সামাজিক ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে শহুরে ওরাওঁ যারা খ্রিস্টান,তাঁরা  গির্জা-সম্পর্কিত সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থেকে তাঁরা তাদের বিনোদন যাপন করে। তবে বর্তমানে বিহারের ওরাওঁরা কোনো লোকশিল্পের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত নয়। পূর্বে কিছু ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন ভাবে মাদুর-বয়ন, দড়ি তৈরি এবং ছুতার কাজ করলেও সেগুলি ওঁরাও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার পক্ষে যথেষ্ট নয়।

একটি সাধারণ ওঁরাও পরিবারে পাঁচ থেকে সাতজন সদস্য থাকে। ওরাওঁরা সাধারণত নিজের গ্রাম এবং গোষ্ঠীর বাইরে বিবাহ করে । তবে  কিষাণ (চাষি) এবং কুদাস (অদক্ষ শ্রমিক) এই দলগুলো নিজেদের মধ্যে বিয়ে করার প্রবণতা রাখে। ওরাদের মধ্যে বিয়েতে কোন পণ দেওয়ার প্রথার প্রচলন নেই। বিবাহের ব্যবস্থাও  বেশ সাধারণ। পাত্রপক্ষ শুধুমাত্র নগদ সাত টাকা এবং কিছু জামাকাপড় প্রদান করে। বিবাহের সাথে যুক্ত অনেক অনুষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীয় আচার হল সিঁদুর দিয়ে অভিষেক করা। বর একটি জোয়ালের উপর দাঁড়িয়ে একটি মশলা বাটার পাথর দিয়ে কনের কপালে এবং চুলের বিভাজনে সিঁদুর লাগায়। পালাক্রমে কনে বরের কপালেও সিঁদুর লাগায়। ওরাওঁদের মধ্যে বিবাহকে একটি আজীবনের সম্পর্ক বলে মনে করা হয়, এদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ বিরল।ওঁরাওরা মনে করেন বিবাহের জন্য সর্বোত্তম বয়স পুরুষদের জন্য ১৬ থেকে ২০ বছর এবং মেয়েদের জন্য ১৩ এবং ১৬ বছরের মধ্যে, যা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে জাতীয় আইন লঙ্ঘন করে।তবে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ওঁরাওদের তাদের পরম্পরাগত চিন্তাভাবনা থেকে অনেকটা সরিয়ে এনেছে। অন্যদিকে খ্রিস্টান ওঁরাওদের বিবাহ গির্জার নির্দেশ মেনে হয়ে থাকে।    

ওরাওঁ পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হল একটি লম্বা সুতির কাপড় যার প্রতিটি প্রান্তে লাল সীমানা, যা কোমরের চারপাশে আবৃত থাকে। মাথার চারপাশে ব্রাস বা সিলভারের একটি হেয়ার ব্যান্ড, কানে দুল, গলায় মালা (প্রায়ই রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে তৈরি) এবং ডান হাতের বাহুতে একটি রূপার চুড়ি পরার প্রচলন ছিল।যদিও বর্তমানে ওঁরাও পুরুষেরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পরিবর্তে  ধুতি, শার্ট এবং প্যান্টকে গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে ওরাওঁ নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে একটি সাদা সুতির শাড়ি থাকে, যার এক প্রান্তে পাঁচটি লাল রেখা রয়েছে। তারা কানের দুল, গলায় মালা, বাহু ও গোড়ালিতে চুড়ি এবং পায়ের আংটি পরে। এই অলঙ্কারগুলি সাধারণত পিতল, তামা, রূপা বা সোনা দিয়ে তৈরি হয়। তাঁরা কপালে বিশেষ উলকি চিহ্ন করে। তবে মহিলারাও তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ছেড়ে অনেকেই রঙ্গিল শাড়ী ও চুড়িদার পরছে ।ওরাওরা আমিষভোজী এবং শূকর, ছাগল, মুরগি এবং মহিষের মাংস খায়। এই মাংসের বেশির ভাগই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পশু বলির পর ভোজে খাওয়া হয়। প্রধান খাদ্যশস্য হল চাল, গম এবং ভুট্টা। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই অ্যালকোহল পান করে। তাঁরা রাইস-বিয়ার বাড়িতে তৈরি করে এবং উৎসবে পান করে।

ওরাওঁ উপজাতিরা তফসিলি উপজাতি হিসাবে মনোনীত হওয়ার পরও প্রতিনিয়ত নানা রকম  সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তাদের অধিকৃত জমির কম উৎপাদনশীলতার কারণে তাঁরা, প্রায়ই অনেক বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং চরম দারিদ্র্যের শিকার হতে হয়। অনেকে আবার সম্পূর্ণভাবে তাদের জমি হারিয়ে কায়িক শ্রমের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। সর্বস্বান্ত পরিবারগুলি যারা কাজ খোঁজার জন্য শহুরে এলাকায় চলে যায় তাদের কাছে বৈষম্য এবং শোষণ একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে খ্রিস্টান ওরাওনদের মধ্যে এই সমস্যাটা তেমন নেই। তবে সংরক্ষণের বিষয়ে খ্রিস্টান এবং অ-খ্রিস্টান ওরাওঁদের মধ্যে একটি বিরোধ রয়েছে।

খবরটি শেয়ার করুণ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন


পোল্ট্রি শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে চলেছে নতুন জিন প্রযুক্তি

উত্তরাপথ - পোল্ট্রি শিল্পে পুরুষ ছানা মারার অভ্যাস দীর্ঘকাল ধরে নৈতিক উদ্বেগের বিষয়।পরিসংখ্যানে প্রকাশ প্রতি বছর পোলট্রিগুলিতে ৭ বিলিয়ন পুরুষ ছানাকে হত্যা করা হয়।কারণ পুরুষ ছানারা ডিম দিতে পারে না সেই সাথে তারা  মাংসের জন্যও উপযুক্ত না হওয়ার কারণে,তারা অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক বলে বিবেচিত হয় । সেই কারণে ডিম ফোটার পরপরই তাদের euthanized করা হয়।এবার এই সমস্যা সমাধানে মধ্য ইস্রায়েলের Yuval Cinnamon এর গবেষণাগারে এক নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করা হয় যার দ্বারা সমস্ত ছানাই মহিলা হবে।এক্ষেত্রে পুরুষ ছানাগুলিকে সম্পূর্ণভাবে ডিম থেকে বেরোনোর আগেই তাদের বাঁধা দেওয়া হবে। এই নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার মুর্গীর পুরুষ ছানাগুলিকে প্রায়শই ম্যাসারেশন বা গ্যাসিং পদ্ধতির মাধ্যমে হত্যা করার মত অমানবিক কাজ বন্ধ করতে সাহায্য করবে। .....বিস্তারিত পড়ুন

চাকরি ছাড়ার পর ফেরত দিতে হলো অফিসে খাওয়া চায়ের দাম

উত্তরাপথঃ চা কে আমরা যতই বলি স্ট্রিট ফুড বলি না কেন আসলে এটি এমন একটি পানীয় যা বিশ্ব অর্থনীতির বিশ্বায়নকে চালিত করেছিল। দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলে কর্মীদের মধ্যে ক্লান্তি কিংবা বিরক্তি কাজ করে, তা কাটাতেই প্রায় প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি অফিসেই কম বেশি চা-কফি খাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছাড়ার পর দুই কর্মীকে অফিসে যত কাপ চা খেয়েছেন, তার বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। এই বিরল কাণ্ড ঘটেছে চীনে।ঘটনা চীনের আনহুই প্রদেশের। সেখানে দুই কর্মী চাকরি ছেড়েছিলেন। খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, আমরা অনেকেই চাকরি ছেড়ে থাকি। কিন্তু পরের ধাপে যা ঘটলো, তা কোনভাবেই স্বাভাবিক নয়। .....বিস্তারিত পড়ুন

Diabetes Treatment: রক্তে শর্করা স্থিতিশীল করতে ডালিয়া ফুলের নির্যাস কার্যকর

উত্তরাপথঃ ডায়াবেটিস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।সম্প্রতি গবেষণায় ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Otago)নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা ক্লিনিকাল ট্রায়ালের মাধ্যমে আবিষ্কার করেছে যে ডালিয়া ফুলের পাপড়ির নির্যাস ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করা স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে। সেন্টার ফর নিউরোএন্ডোক্রিনোলজির একজন সহযোগী অধ্যাপক আলেকজান্ডার টুপসের( Alexander Tups) নির্দেশনায়, দলটি খুঁজে পেয়েছে যে, উদ্ভিদের একটি অণু, যা মস্তিষ্কে কাজ করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রন করার জন্য শরীরের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।প্রসঙ্গত ডায়াবেটিস হল একটি দীর্ঘস্থায়ী বিপাকীয় ব্যাধি যা অপর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদনের কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যাধিক বেড়ে যায়। .....বিস্তারিত পড়ুন

Scroll to Top